তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রাথমিক আলোচনা (Introductory Discussion of ICT):

সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে মানুষের চিন্তার বিকাশ ঘটেছে। সেই সাথে বিকাশ ঘটতে থাকে মানুষের জীবনযাত্রার কৌশল ও পদ্ধতির। নিত্য নতুন আবিষ্কার মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করছে। বর্তমান যুগকে বলা হয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা Information & Communication Technology (ICT) এর যুগ। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির কল্যাণে গোটা পৃথিবী আজ মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। আজ যারা এই প্রযুক্তিকে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগাতে পারছে তারাই সাফল্য লাভ করছে। তথ্য প্রযুক্তি (Information Technology): তথ্য প্রযুক্তি হলো প্রযুক্তির এমন একটি শাখা যা মূলত কম্পিউটারের সাহায্যে তথ্য বিতরণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং সংরক্ষণ করার সাথে সংশ্লিষ্ট।
তথ্য সংগ্রহ, এর সত্যতা ও বৈধতা যাচাই, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, আধুনিকীকরণ, পরিবহন, বিতরণ ও ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিকে বলা হয় তথ্য প্রযুক্তি বা ইনফরমেশন টেকনোলজি (IT)।

উপাত্ত: সুনির্দিষ্ট আউটপুট বা ফলাফল পাওয়ার জন্যে ব্যবহৃত কাঁচামাল সমূহকে ডেটা বা উপাত্ত (Data) বলে। Datum শব্দের বহুবচন হল Data যার অর্থ ফ্যাক্ট (Fact)।

তথ্য: আর তথ্য বা ইনফরমেশন মানে সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো ডেটা যা সহজবোধ্য, অর্থবহ, কার্যকর ও ব্যবহারযোগ্য। ডেটাকে প্রসেস করে ইনফরমেশনে রূপান্তর করা হয়।

যোগাযোগ প্রযুক্তি (Communication Technology): কম্পিউটার কিংবা অন্য কোন যন্ত্রের মাধ্যমে ডেটাকে একস্থান হতে অন্য স্থানে কিংবা এক ডিভাইস হতে অন্য ডিভাইসে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া হচ্ছে ডেটা কমিউনিকেশন। কাজেই কমিউনিকেশন বা যোগাযোগ এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে এক স্থান হতে অন্য স্থানে নির্ভরযোগ্যভাবে ডেটা বা উপাত্ত আদান-প্রদান করা যায়। ভেটা কমিউনিকেশন ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিকে যোগাযোগ প্রযুক্তি বা কমিউনিকেশন টেকনোলজি (CT) বলা। হয়। ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদি যোগাযোগ প্রযুক্তির উদাহরণ।।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (Information and Communication Technology): তথ্য প্রযুক্তির সাথে যোগাযোগ প্রযুক্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে এদেরকে একত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (Information and Communication Technology) সংক্ষেপে ICT বলে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মূলে রয়েছে আধুনিক টেলিযোগাযোগ, ইন্টারনেট ও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা।


তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উপকরণসমূহ:
১) কম্পিউটার
২) ইন্টারনেট
৩) কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা
৪) রেডিও টেলিভিশন
৫) স্যাটেলাইট
৬) টেলিকমিউনিকেশন
৭) মোবাইল কমিউনিকেশন

কম্পিউটার: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মূলে রয়েছে কম্পিউটার। গ্রীক শব্দ Compute হতে Computer শব্দের উৎপত্তি। Compute শব্দের অর্থ হল গণনা করা। মূলত গণনার কাজের জন্য কম্পিউটার আবিষ্কার করা হলেও বর্তমানে কম্পিউটারের ব্যবহার আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সকল কাজে জড়িয়ে গিয়েছে। কম্পিউটার হলো হিসাব-নিকাশ করা অথবা অন্য কোন যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার ইলেকট্রনিক যন্ত্র যা তথ্য সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং প্রদান করে।

কম্পিউটারে কাজকে তিনটি প্রধান ইউনিটে ভাগ করা হয়েছে;
১. ইনপুট-আউটপুট ইউনিট (I/O Unit)
২. সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট (Central Processing Unit)
৩. মেমোরি ইউনিট (Memory Unit)



ইনপুট/ আউটপুট ইউনিট (I/O Unit):
কম্পিউটার ব্যবহারকারীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করার কাজ করে কম্পিউটারের ইনপুট ইউনিট। এই ইনপুট (Input) ইউনিটের হয়ে কাজ করার মধ্যে কী বোর্ড, মাউস অন্যতম। ইনপুট দেওয়া তথ্য এবং উপাত্ত প্রক্রিয়াজাত শেষে ফলাফল বা আউটপুট হিসেবে প্রদর্শনের জন্য মনিটর বা ভিনপ্লে আউটপুট ইউনিট হিসেবে কাজ করে। এই ইনপুট এবং আউটপুট ইউনিট একত্রে I/O Unit গঠন করে।

সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট (CPU): CPU বা Central Processing Unit এর দুটি অংশ থাকে। যথা-
১. ALU (Arithmetic and Logic Unit)
২. CU (Control Unit):
ALU বিভিন্ন লজিকাল এবং গাণিতিক অপারেশন করে থাকে আর CU অংশ পুরো কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

মেমোরি ইউনিট (Memory Unit):
ডেটা এবং ইনফরমেশন সংরক্ষণের কাজ করে থাকে এই ইউনিট। যেমন- রেজিস্টার, র‍্যাম (RAM), রম (ROM), হার্ড-ডিস্ক (Hard-Disk), ম্যাগনেটিক ডিস্ক ইত্যাদি মেমোরি ইউনিটের অংশ।

বিশ্বগ্রাম বা গ্লোবাল ভিলেজ

বিখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানি ও দার্শনিক মার্শাল ম্যাকলুহান ১৯৬২ সালে সর্বপ্রথম বিশ্বগ্রাম বা গ্লোবাল ভিলেজ সম্পর্কে ধারণা দেন। তার মতে, ইলেক্ট্রনিক কমিউনিকেশন প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তারের ফলে সময় ও দূরত্ব ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পৃথিবী একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। বিশ্বগ্রাম বা গ্লোবাল ভিলেজ এমন একটি শব্দ যেখানে গোটা পৃথিবীকে একটি গ্রাম হিসেবে কল্পনা করা হয়।

“গ্রাম” শব্দটির সাথে আমরা সবাই পরিচিত।
গ্রামে সবাই মিলেমিশে একসাথে বসবাস করে।
গ্রামে সবাই একে অপরকে ভালোভাবে চিনতে পারে।
সবাই সবার সুখ দুঃখে এগিয়ে যায়।
গ্রামের কোথায় কলেজ, হাটবাজার, রাস্তা-ঘাট ইত্যাদি আছে তা সবারই জানা।
গ্রামে কোথাও কোনো অনুষ্ঠান বা কোনো ঘটনা ঘটলে সবাই মুহূর্তের মধ্যে জানতে পারে।

ঠিক তেমনই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি তথা ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে আজ সমগ্র পৃথিবী গ্রামের মতোই ছোট হয়ে আসছে।
ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমরা খুব সহজে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারি।
যে কোনো বিষয়ে প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করতে পারি।
পরস্পরের মধ্যে জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারি।
পৃথিবীর কোথায় কি ঘটছে তা আমরা মুহূর্তের মধ্যে জানতে পারি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে আমরা যে কোনো দেশের মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারি, তাদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারি যা আমাদের ব্যবসায় উন্নতি এবং পারস্পারিক সম্পর্কের উন্নতি ঘটায়।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বিশ্বগ্রামকে নিম্নোক্তভাবে সংজ্ঞায়িত করেন-
অক্সফোর্ড আমেরিকান ডিকশনারি অনুযায়ী
"বিশ্বকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত একক সম্প্রদায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে" "(The world considered a single community by telecommunication.)"
উইকিপিডিয়ার একটি উদ্ধৃতি অনুযায়ী, "বিশ্বগ্রাম হচ্ছে একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ।" "(The global village is the sociological and cultural structure.)"
মার্টিন আলব্রো বলেন, "বিশ্বগ্রাম হচ্ছে সামগ্রিক কমিউনিটির মধ্যে সমস্ত মানুষকে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া।"
এন্থনি গিডেন্স বলেন, "বিশ্বগ্রাম হচ্ছে বিশ্বব্যাপী সামাজিক সম্পর্কের প্রগাঢ়করণ।"
উপরের সকল সংজ্ঞা অনুযায়ী বলা যায়- বিশ্বগ্রাম বা গ্লোবাল ভিলেজ হচ্ছে এমন একটি সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা যার আনুষাঙ্গিক সকল কিছুই ইন্টারনেট তথা যোগাযোগ প্রযুক্তির মধ্যে বিদ্যমান।

বর্তমানে বাংলাদেশের ইউনিয়নভিত্তিক তথ্যসেবা কেন্দ্র ইন্টারনেট সেবা প্রদান করে বিশ্বকে গ্রামের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছে। ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্রে অনলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সরকারি সেবা যেমন- জমির পর্চা, জীবন বীমা, পল্লী বিদ্যুতের বিল পরিশোধ, সরকারি ফরম, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল, অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, অনলাইন জন্ম- মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ, কৃষি তথ্য, স্বাস্থ্য পরামর্শ প্রভৃতি সহজেই পাওয়া যায়। বেসরকারি সেবাসমূহ হলো- মোবাইল ব্যাংকিং, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ছবি তোলা, ইন্টারনেট ব্রাউজিং, ই-মেইল, চাকরির তথ্য কম্পোজ, ব্রিটিশ কাউন্সিলের ইংরেজি শিক্ষা, ভিসা আবেদন ও ট্র্যাকিং, ভিডিও কনফারেন্সিং, প্রিন্টিং, স্ক্যানিং, ফটোকপি, লেমেনেটিং প্রভৃতি।


> বিশ্বগ্রাম ধারণা সংশ্লিষ্ট প্রধান উপাদানগুলোঃ

Comments