ডিজিটালকরণের পথে বাংলাদেশ।

১৯৬৪ সালে বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তান) প্রথম কম্পিউটারের ব্যবহার হয় পাকিস্তান পরমাণু শক্তিকেন্দ্রে (বর্তমান' বাংলাদেশ পরমাণু শক্তিকেন্দ্র)। এর পরপরই বাংলাদেশে কম্পিউটারের ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের পর থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও গবেষণাকেন্দ্রে কম্পিউটারের ব্যাবহার শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET) এ কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারি ডিপার্টমেন্টের যাত্রা শুরু হয় যা বাংলাদেশে আইটি শিক্ষায় সবচেয়ে বড় অবদান রাখে। পার্সোনাল কম্পিউটার তৈরির পর ১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশে কম্পিউটারের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার শুরু হলে কম্পিউটার ব্যবহার আরো বৃদ্ধি পায়। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে কম্পিউটার ও আইটি রিলেটেড সকল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে 'বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল' গঠিত হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশে তথ্য প্রযুক্তি একটি ব্যাপক আলোচিত বিষয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০০ টির ও অধিক সফটওয়্যার হাউজ, ৩৫টি ডাটা এন্ট্রি সেন্টার, কয়েক হাজার আইটি ট্রেনিং সেন্টার এবং অসংখ্যা কম্পিউটার শপ রয়েছে। Wolframalpha সাইট এর জরিপ অনুসারে বর্তমান বাংলাদেশে ৬,৫১,৯০,০০০ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা মতে দেশের প্রত্যেকটি জেলা-উপজেলায় আইটি সেন্টার খোলা হয়েছে। DDN (Digital Data Network ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এমনকি সফটওয়্যার রপ্তানীরও সূচনা হয়েছে বাংলাদেশে। ই-কমার্স, ই-সেবা, ই-গভর্ন্যান্স, ইলার্নিং, কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং ওয়েব ব্রাউজিং, মাল্টি মিডিয়া প্রোডাকশন ইত্যাদি ফলে দেশের প্রতিটা ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে।
উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিসমূহঃ-

ই-লার্নিং (E-Learning): শিক্ষাক্ষেত্রের আধুনিক পদ্ধতি ই-লার্নিং এর পূর্ণরূপ হলো ইলেকট্রনিক লার্নিং (Electronic Learning)। যে পাঠদানের জন্য সিডি রম, ইন্টারনেট, ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক কিংবা টেলিভিশন চ্যানেল ব্যবহার করা হয় তাকে ই-লার্নিং বলে। বিজ্ঞানের যে বিষয়গুলো শ্রেণিকক্ষে হাতে কলমে দেখানো সম্ভব ছিল না ই-লার্নিং এর সাহায্যে মাল্টিমিডিয়ার দ্বারা তা এখন করে দেখানো সম্ভব হচ্ছে। ই-লার্নিং সনাতন পাঠদানের বিকল্প নয় পরিপূরক মাত্র। ই-লার্নিংকে Distance Learning বলা হয়।

ই-গভর্ন্যান্স (E-governance): শাসন ব্যবস্থায় ও প্রক্রিয়ার ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল পদ্ধতির প্রয়োগই হচ্ছে ই-গভর্ন্যান্স। ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রচলনের ফলে সরকারি ব্যবস্থাসমূহকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার পাশাপাশি সরকারি ব্যবস্থাসমূহের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।

ই-কমার্স (ই-বাণিজ্য) (E-Commerce): ইলেকট্রনিক মাধ্যমে যে বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় তাকে ই-কমার্স (Electronic Commerce) বা ই-বাণিজ্য বলা হয়। একটি দেশের বিকাশ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাণিজ্যের উন্নতির কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে সহায়ক উপায় হচ্ছে ই-কমার্স এর প্রসার।

ই-সার্ভিস (E-Service): সরকারি বা বেসরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সেবাদানে ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল পদ্ধতির প্রয়োগ।

ই-পূর্জি (E-Purjee): পূর্জি হচ্ছে চিনিকলসমূহে কখন আখ সরবরাহ করতে হবে সে জন্য আওতাধীন আখ চাষিদের দেওয়া একটি অনুমতি পত্র। ই-পূর্জি হলো মোবাইল ফোনে এসএমএস এর মাধ্যমে আখচাষীদেরকে দেওয়া অনুমতি পত্র। দেশের প্রথম দিককার ই-সেবাসমূহের মধ্যে ই-পূর্জি অন্যতম।

ই-এমটিএস (ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার সিস্টেম) (Electronic Money Transfer System): বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার সিস্টেমের মাধ্যমে দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে নিরাপদে, দ্রুত ও কম খরচে টাকা পাঠানো যায়। ১ মিনিটের মধ্যে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাঠানো যায়। দেশের প্রায় সকল ডাকঘরে এই সেবা পাওয়া যায়।

ই-পর্চা (E-Porcha): বর্তমানে দেশের সকল জমির রেকর্ডের অনুলিপি অনলাইনে সংগ্রহ করা যায়। এই পদ্ধতিকে ই-পর্চা বলা হয়। পৃথিবীর যেকোনো অবস্থান থেকে যে কেউ অনলাইনে আবেদন করে জমির রেকর্ডের সংগ্রহ করতে পারেন।

ই-স্বাস্থ্যসেবা (E-Clinical): ই-স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে যেকোনো নাগরিক যেকোনো চিকিৎসা সেবা ও পরামর্শ পাচ্ছেন। দেশের সকল হাসপাতালে একটি করে মোবাইল ফোন দেওয়া আছে। বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কর্মরত চিকিৎসকরা এই মোবাইল ফোনে স্বাস্থ্য পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

টেলিমেডিসিন (Telemedicine): টেলিমেডিসিন, ই-স্বাস্থ্যসেবারই অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়। সাধারণত জরুরী অবস্থায় দূরবর্তী স্থানে কোন রোগীকে টেলিফোন, ইন্টারনেট বা ই-মেইলের মাধ্যমে চিকিৎসা দেয়াকে টেলিমেডিসিন বলা হয়। -এর মাধ্যমে একজন রোগী উপজেলা থেকে জেলা সদরে না এসেও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সেবা ও পরামর্শ নিতে পারেন।

COD (ক্যাশ অন ডেলিভারি)ঃ মোবাইল বা কার্ড ছাড়াও ই-কমার্সে আরো একটি বিল পরিশোধ পদ্ধতি রয়েছে। এটিকে বলা হয় প্রাপ্তির পর পরিশোধ বা ক্যাশ অন ডেলিভারি (COD)। এই পদ্ধতিতে ক্রেতা বিক্রেতার ওয়েবসাইটে বসে পছন্দের পণ্যটির অর্ডার দেন। বিক্রেতা তখন পণ্যটি ক্রেতার কাছে পাঠিয়ে দেন। ক্রেতা পণ্য পেয়ে বিল পরিশোধ করেন।

ই-সেন্টার (E-Center): ইনফরমেশন সেন্টার, যেখানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সেবা সংক্রান্ত সকল তথ্য সরবরাহ করা হয়।

ডিজিটাল কী? ডিজিট শব্দটির অর্থ 'সংখ্যা বা অংক', কম্পিউটারে ব্যবহার করার জন্যে সব কিছুকেই সংখ্যা বা অংকে রূপান্তর করতে হয় বলে ডিজিটাল শব্দটি আসলে বম্পিউটারে ব্যবহারের উপযোগী কিছু বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। মূলতঃ digit বা অংক বলতে বাইনারী ডিজিট শূন্য (0) ওয়ান (1) কে বুঝানো হয়।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে কী বুঝানো হয়েছে? ডিজিটাল বাংলাদেশ কথাটি শুধু একটি 'কম্পিউটার প্রস্তুত দেশ' হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি। এটি আরো অনেক ব্যাপক। ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে আসলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে গড়ে তোলা আধুনিক বাংলাদেশ বোঝানো হয়।

ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য: সব ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র মোচনের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য। এই লক্ষ্যে পৌছানোর জন্যে আমাদের পুরাতন মানসিকতার পরিবর্তন করে ইতিবাচক বাস্তবতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তা করা খুব জরুরি।

ডিজিটাল বাংলাদেশের মূলকথা: ডিজিটাল বাংলাদেশের পেছনের মূল কথাটি হচ্ছে দেশের মানুষের জন্যে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, গুচ্ছতা, দায়বদ্ধত, এবং সুবিচার নিশ্চিত করা এবং সেগুলোর জন্যে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করা। তার চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে সকল শ্রেণির সব ধরনের মানুষের জীবনের মান উন্নয়ন।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন: ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্পের বাস্তবায়নের জন্যে সরকার চারটি সুনির্দিষ্ট বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে; সেগুলো হচ্ছে- মানবসম্পদ উন্নয়ন, জনগণের সম্পৃক্ততা, সিভিল সার্ভিস এবং দৈনন্দিন জীবনে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার।

Comments